
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে অটোমেশন: ভয় নয়, প্রস্তুতি নিন ভবিষ্যতের জন্য
১. ভূমিকা: অটোমেশন কী এবং কেন এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ?
“অটোমেশন” শব্দটি শুনতে কিছুটা জটিল মনে হলেও এর ধারণাটি বেশ সহজ। সাধারণ ক্যালকুলেটর যেভাবে আমাদের বড় বড় হিসাবকে এক নিমিষে সমাধান করে দেয়, ঠিক সেভাবেই বিভিন্ন শিল্পে মানুষের করা পুনরাবৃত্তিমূলক (repetitive) কাজগুলো যখন প্রযুক্তি বা রোবট দিয়ে করানো হয়, তখন তাকেই অটোমেশন বলে। এটি এখন আর কোনো ভবিষ্যতের ধারণা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ঘটছে এবং এখন বাংলাদেশের শিল্পখাতগুলোতেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলছে। এর ফলে আমাদের চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে—কিছু পুরনো কাজ হারিয়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কাজের সুযোগ।
এই আর্টিকেলের উদ্দেশ্য হলো অটোমেশনের ফলে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, এর চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং আমাদের তরুণদের জন্য কী নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার ও ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরা। ভয় বা আতঙ্কিত না হয়ে, বরং সঠিক তথ্য জেনে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই আমাদের লক্ষ্য। চলুন দেখে নেওয়া যাক, বাংলাদেশের চাকরির বাজারে এই পরিবর্তনের প্রভাব কতটা ব্যাপক।
২. পরিবর্তনের চিত্র: বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে অটোমেশনের সামগ্রিক প্রভাব
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচটি চাকরির মধ্যে প্রায় দুটি অটোমেশনের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সব চাকরি হারিয়ে যাবে, বরং কাজের ধরণে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনের প্রভাব সবার উপর সমানভাবে পড়বে না। কিছু গোষ্ঠীর কর্মী অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারেন।
- নারী কর্মী: সাধারণত, স্বল্প শিক্ষিত নারী কর্মীরা এমন সব কাজে নিযুক্ত থাকেন যেখানে কাজগুলো মূলত পুনরাবৃত্তিমূলক, যেমন—পোশাক শিল্পে সেলাই করা। এই ধরনের কাজগুলো মেশিন বা রোবট দিয়ে সহজেই করানো সম্ভব, ফলে তাদের চাকরি বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
- স্বল্প শিক্ষিত কর্মী: যেসব কাজে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন হয় না, সেখানে সাধারণত কায়িক শ্রম ও নিয়মমাফিক কাজই বেশি। মেশিন এই কাজগুলো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সাথে করতে পারে, তাই এই কর্মীদের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য চাকরি পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া নয়, বরং কাজের ধরণ বদলে দেওয়া। যেমনটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তি “কিছু কাজ নিজের আওতায় নিয়ে নেবে এবং একই সাথে নতুন কাজের সুযোগও তৈরি করবে।” এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলার একমাত্র উপায় হলো নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করা।
এই পরিবর্তন নির্দিষ্ট কিছু শিল্পে, যেমন দেশের গার্মেন্টস এবং আসবাবপত্র খাতে, কীভাবে ঘটছে তা এবার বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
৩. শিল্পে অটোমেশনের প্রভাব: তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাত
তৈরি পোশাক বা রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG) খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ জোগান দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে অটোমেশনের প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি “Sewbot” নামের একটি রোবটিক প্রযুক্তি তৈরি করেছে যা মানুষের সাহায্য ছাড়াই কাপড় সেলাই করতে পারে। একইভাবে, বাংলাদেশের মোহাম্মদী ফ্যাশন সোয়েটার্স লিমিটেডের কারখানায় জার্মান-নির্মিত স্বয়ংক্রিয় নিটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে আগে শত শত কর্মী কাজ করতেন। এই প্রযুক্তিগুলো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করছে এবং উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করছে।
এই পরিবর্তনের ফলে কাজের ধরণে যে পার্থক্য আসছে, তা নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
বদলে যাচ্ছে কাজের ধরণ: গার্মেন্টস খাত
| ঝুঁকিতে থাকা পুরনো কাজ | তৈরি হওয়া নতুন সুযোগ |
| সুইং মেশিন অপারেটর (পুনরাবৃত্তিমূলক সেলাই) | CAD-CAM অপারেটর (কম্পিউটার-ভিত্তিক ডিজাইন) |
| কোয়ালিটি কন্ট্রোল ইন্সপেক্টর (ম্যানুয়াল) (চোখে দেখে মান পরীক্ষা) | এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ERP) এক্সপার্ট (সফটওয়্যার দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা) |
| প্যাটার্ন মেকার (ম্যানুয়াল) (হাতে ডিজাইন তৈরি) | পিক অ্যান্ড প্লেস রোবট অপারেটর (রোবট পরিচালনা) |
| ফ্লোর সুপারভাইজার (সাধারণ তদারকি) | আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক এক্সপার্ট (AI সিস্টেম পরিচালনা) |
এ থেকে বোঝা যায়, যদিও লাখ লাখ সাধারণ সেলাইয়ের কাজ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তবে যারা এই নতুন স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলো ডিজাইন, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে, তাদের জন্য নতুন এবং উন্নত কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টসের মতো, আসবাবপত্র শিল্পেও অটোমেশন নিয়ে আসছে নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ।
৪. শিল্পে অটোমেশনের প্রভাব: আসবাবপত্র (ফার্নিচার) খাত
আসবাবপত্র বা ফার্নিচার শিল্প বাংলাদেশের একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত, যেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অসংখ্য ছোট উদ্যোগও কাজ করছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড বা নিজস্ব ডিজাইনের পণ্য তৈরির জন্য এই খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, HATIL সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি উৎপাদন ইউনিট চালু করেছে, যা প্রমাণ করে এই শিল্পেও অটোমেশন প্রবেশ করেছে।
অটোমেশনের কারণে এই খাতেও কাজের ধরণে পরিবর্তন আসছে:
বদলে যাচ্ছে কাজের ধরণ: আসবাবপত্র খাত
| ঝুঁকিতে থাকা পুরনো কাজ | তৈরি হওয়া নতুন সুযোগ |
| ওয়ার্কার হেল্পার (কাঠমিস্ত্রির সহকারী, কায়িক শ্রম) | থ্রিডি প্রিন্টিং প্রফেশনাল (নতুন মডেল তৈরি) |
| চার্জ হ্যান্ড (মাঝারি স্তরের নিয়ম-ভিত্তিক কাজ) | রোবটিক্স কন্ট্রোলার (উৎপাদন রোবট পরিচালনা) |
| সাধারণ কার্পেন্টার (হাতে কাজ করা) | বিগ ডেটা অ্যানালিস্ট (বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ) |
আসবাবপত্র খাতে “লেবার ফোর্স পোলারাইজেশন” বা শ্রমশক্তির মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। এর সহজ অর্থ হলো, অটোমেশন মাঝারি দক্ষতার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো (যেমন: চার্জ হ্যান্ড) কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, উচ্চ-দক্ষতার প্রযুক্তিগত কাজ (যেমন: রোবটিক্স কন্ট্রোলার) এবং এমন কিছু কম-দক্ষতার কাজ যা মেশিন করতে পারে না (যেখানে সৃজনশীলতা বা মানুষের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজন), সেগুলোর চাহিদা বাড়ছে। এই মেরুকরণের কারণেই মাঝারি দক্ষতার কর্মীদের জন্য নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যা তাদের উচ্চ-দক্ষতার কাজে প্রবেশ করতে সাহায্য করবে।
এই নতুন ধরণের কাজের জন্য কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
৫. ভবিষ্যতের চাবিকাঠি: যে দক্ষতাগুলো আপনাকে এগিয়ে রাখবে
গার্মেন্টস ও ফার্নিচার শিল্পের নতুন কাজগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এখন থেকেই কিছু নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর মনোযোগ দিলে আপনি অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবেন।
- ডেটা অ্যানালাইসিস (Data Analysis): আজকের দিনে কোম্পানিগুলো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা ডেটা বা তথ্যের ওপর নির্ভর করে। যারা ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে পারে, তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী। গার্মেন্টস খাতে আমরা যে ‘ERP এক্সপার্ট’ বা ফার্নিচার খাতে ‘বিগ ডেটা অ্যানালিস্ট’-এর কথা বলেছি, তাদের সফলতার মূল ভিত্তিই হলো এই ডেটা অ্যানালাইসিস দক্ষতা। Power BI বা Tableau-এর মতো টুলস ব্যবহার করে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজ করার দক্ষতা আপনাকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
- প্রোগ্রামিং এবং অটোমেশন (Programming and Automation): আধুনিক কারখানাগুলো স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে চলে। এই সিস্টেমগুলো পরিচালনা করার জন্য প্রোগ্রামিং লজিকের প্রাথমিক ধারণা থাকা অপরিহার্য। যেমন—গার্মেন্টস খাতের ‘পিক অ্যান্ড প্লেস রোবট অপারেটর’ বা ফার্নিচার খাতের ‘রোবটিক্স কন্ট্রোলার’-এর মতো পদে কাজ করতে হলে Python-এর মতো প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের বেসিক জ্ঞান থাকা জরুরি। এমনকি কোডিং না জেনেও Zapier-এর মতো নো-কোড টুল ব্যবহার করে ছোটখাটো অটোমেশন তৈরি করার দক্ষতাও এখন অনেক মূল্যবান।
- ডিজিটাল মার্কেটিং (Digital Marketing): যেহেতু সব ব্যবসাই এখন অনলাইন-ভিত্তিক হচ্ছে, তাই গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের দক্ষতা অপরিহার্য। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO) এবং সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের মতো দক্ষতাগুলো আপনাকে চাকরির বাজারে বিশেষ সুবিধা দেবে, বিশেষ করে ফার্নিচারের মতো কাস্টমাইজড পণ্য গ্রাহকের কাছে তুলে ধরার জন্য।
- ক্লাউড কম্পিউটিং (Cloud Computing): আধুনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ডেটা এবং অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনার জন্য Amazon Web Services (AWS)-এর মতো ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এই বিষয়ে দক্ষতা থাকলে দেশের বাইরেও চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং এটি ডেটা অ্যানালাইসিস ও ERP সিস্টেম পরিচালনার মতো কাজগুলোকে আরও সহজ করে তোলে।
তবে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি যোগাযোগ (communication), সমস্যা সমাধান (problem-solving) এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার (teamwork) মতো “সফট স্কিল” থাকাও সমানভাবে জরুরি। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার অর্থ ভয় পাওয়া নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করা।
৬. উপসংহার: পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াই সাফল্যের মূলমন্ত্র
অটোমেশন বাংলাদেশের চাকরির বাজারকে বদলে দিচ্ছে—এটি একটি বাস্তবতা। প্রযুক্তি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকে প্রতিস্থাপন করে এমন সব নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করছে যেখানে প্রযুক্তিগত, বিশ্লেষণাত্মক এবং সৃজনশীল দক্ষতার প্রয়োজন।
এই পরিবর্তনকে হুমকি হিসেবে না দেখে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে “Leapfrogging” বা লাফ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার একটি দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, পুরনো প্রযুক্তি ধাপে ধাপে গ্রহণ না করে আমরা সরাসরি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে চলে যেতে পারি, যা আমাদের বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
একজন শিক্ষার্থী বা চাকুরিপ্রার্থী হিসেবে আপনার জন্য বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট: ক্রমাগত শেখার কোনো বিকল্প নেই। পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ দিন। যারা আজ নিজেকে নতুন প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করবে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত।



